কলাপাড়ায় এসএসসি পরীক্ষায় নকলে সহায়তা, দুই শিক্ষককে অব্যহতি
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৮-০৫-২০২৬ ১১:১৯:৪১ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
০৮-০৫-২০২৬ ১১:১৯:৪১ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
প্রকাশ্যে পরীক্ষার খাতায় অংকের (সমাধান) উত্তরপত্র লিখে সরবরাহ ও কথিত সিকবেডে এসএসসির এক পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দেওয়ার ঘটনায় খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক ফেঁসে গেলেন। গত ৩ মে অংক পরীক্ষার দিনে অসাদুপায় অবলম্বনের দায়ে খেপুপাড়া মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীকে ভিজিলেন্স টিম বহিষ্কার করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। বের হয়ে আসে থলের বিড়াল। বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক জহিরুল ইসলাম (সমাজবিজ্ঞান) ও মেজবা উদ্দিন ওই শিক্ষার্থীকে অংকের সমাধান করে পরীক্ষার বোর্ডের আলাদা বাড়তি খাতা সরবরাহের প্রমাণ মিলেছে। এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব উঠে এসেছে। ওই শিক্ষককে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার সকল দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা সচিবসহ উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদনসহ চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।
এসএসসি ও সমমনা পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ এ ঘটনার পরেই এ সংক্রান্ত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এক সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির প্রধান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক তার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন নকল সরবরাহ করা, কথিত সিকবেড ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়ার ঘটনার সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই শিক্ষকের সরাসরি জড়িতের প্রমাণ মিলেছে। শুধু তাই নয় এই দুই শিক্ষকের যোগসাজশে বহিষ্কৃত পরীক্ষার্থীকে প্রশ্নের উত্তরপত্র লিখে সরবরাহ করা হয়েছিল। এমনকি সিসি ক্যামেরাবিহীন ওই কক্ষের মূল দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক শিক্ষক দেবাশীষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নকলে সরাসরি সহায়তার প্রমাণ মিলেছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক তার তদন্ত প্রতিবেদন গত ৬ মে দাখিল করেছেন।
তিনি তার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, বহিষ্কৃত ওই পরীক্ষার্থীকে শিক্ষাবোর্ডের সরবরাহকৃত অতিরিক্ত খাতায় কয়েকটি অংকের সমাধান লিখে দেওয়ার বিষয় খুঁজে পেয়েছেন। শিক্ষার্থীর খাতার হাতের লেখার সাথে অতিরিক্ত খাতার হাতের লেখার মিল নেই। মূল খাতার অর্ধেকের বেশি খালি থাকা সত্ত্বেও কক্ষ পরিদর্শকের স্বাক্ষর ও তারিখ বিহীন গণিতের সমাধান করা বোর্ডের সরবরাহকৃত অতিরিক্ত খাতা পাওয়া যায়। তদন্ত কর্মকর্তা পরীক্ষা সম্পন্নের দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত শিক্ষক মেজবা উদ্দিনের হাতের লেখা টেস্ট গ্রহণ করেন। যেখানে বলা হয়েছে, বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীর কাছে পাওয়া অতিরিক্ত খাতার লেখার সাথে মেজবা উদ্দিনের হাতের লেখার বহু অক্ষরের মিল পাওয়া গেছে। তারপরও সিআইডির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীর বাবা পর্যন্ত তদন্ত টিম সদস্যকে বলেছেন তার সন্তানের অসুস্থতার খবর তার জানা ছিল না। বহিষ্কৃত এই শিক্ষার্থী খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
কক্ষপরিদর্শক দেবাশীষ চন্দ্র সিকদার তার জবানবন্দীতে উল্লেখ করেছেন, পরীক্ষা চলাকালীন সময় (ঘটনার দিন) শিক্ষক জহিরুল ইসলাম নয় নম্বর কক্ষে (সিসি ক্যামেরাবিহীন) এমসিকিউ পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই সৃজনশীল প্রশ্ন সরবরাহ করেন। কিছুক্ষণ পরেই সহকারী শিক্ষক মেজবা উদ্দিন একই কক্ষে প্রবেশ করে পরীক্ষার্থী হামিম বেপারীর সৃজনশীল প্রশ্নের ছবি তুলে নেন। এক ঘন্টা পরে বোর্ডের সরবরাহকৃত অতিরিক্ত পেপারে প্রশ্নের সমাধান করে হামিমকে সরবরাহ করেন। কক্ষ পরিদর্শক দেবাশীষ শিক্ষক মেজবা উদ্দিনকে বাধা দিলে তিনি ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। কেন্দ্র সহকারী জহিরুল ইসলাম দাঁড়িয়ে থেকে হামিমকে নকলে সহায়তা করেন। এমনকি মেডিকেল সনদ ছাড়া সভাপতি কিংবা কেন্দ্রের পরামর্শ ছাড়া সিকবেডে ক্যামেরাবিহীন কক্ষে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে কেন্দ্র সচিব মুহাম্মদ মহসিন রেজাকে অভিযুক্ত শিক্ষক মেজবা উদ্দিন ও জহিরুল ইসলাম চাপ প্রয়োগ করেন।
কেন্দ্র সচিব জানান, তিনি এই প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ নন। মেডিকেল সনদ ব্যতীত বোর্ডের পরামর্শ ছাড়া সিকবেডে (সিসি ক্যামেরাবিহীন) কক্ষে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ওই দুই শিক্ষক তাকে চাপ প্রয়োগ করেন। বিষয়টি পূর্ব পরিকল্পিত এবং ওই দুই শিক্ষকের এ বিষয়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও তিনি তদন্ত টিমকে জানান।
তদন্ত টিমের প্রধান ও একমাত্র সদস্য মো. ইয়াসীন সাদেক তার মতামতে উল্লেখ করেন, কেন্দ্র সহকারী জহিরুল ইসলাম ও কম্পিউটার অপারেটর, সহকারী শিক্ষক মেজবা উদ্দিন বহিষ্কৃত ওই পরীক্ষার্থীকে পরিকল্পিতভাবে কেন্দ্র সচিব ও কক্ষ পরিদর্শককে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে সিসি ক্যামেরাবিহীন কক্ষে মেডিকেল প্রত্যয়ন ব্যতীত সিকবেডে গণিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং বোর্ড কর্তৃক প্রদানকৃত অতিরিক্ত উত্তরপত্রে নকল সরবরাহ করায় একই সঙ্গে তারা অসাদাচারণ ও ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত হয়েছেন। ঘটনাটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের প্রবিধানমালা-২০২৪ এর প্রবিধান-৫২ (২) (জ), ৫২ (২) (ঝ) এর দন্ড ও প্রবিধান ৫২ এর অপরাধযোগ্য দন্ড ও দি পাবলিক এক্সামিনেশন এক্ট ১৯৮০ এর ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মতামত ব্যক্ত করেছেন।
এই প্রতিবেদনের আলোকে উপরোক্ত দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিব, মহাপরিচালক, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক, উপ-পরিচালক, জেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে বৃহস্পতিবার তদন্ত প্রতিবেদনসহ চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ বলেন, জড়িত দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার কার্যক্রম থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবোর্ডকে গোটা বিষয়টি বিস্তারিতভাবে প্রতিবেদন আকারে প্রদান করা হয়েছে। সরকারের নকলমুক্ত পরিবেশকে এরা সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করতে এমন অপকর্ম করেছেন বলেও তিনি মতামত ব্যক্ত করেন।
এ বিষয় অভিযুক্ত শিক্ষক মেজবা উদ্দিন বলেন, ‘মূলত কেন্দ্র সচিব ও কক্ষ পরিদর্শক তাঁদের অপরাধ আমাদের ওপর চাপাচ্ছেন। আমাদের ওপর আনীত অভিযোগ কিংবা দায় সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। কারণ কেন্দ্রসচিব ও কক্ষ পরিদর্শকের অনুমতি ছাড়া অন্য কারও কক্ষে প্রবেশের কোন সুযোগ নাই। এটি একটা গভীর ষড়যন্ত্র বলেও শিক্ষক মেজবা উদ্দিন মনে করেন।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স